ফারসি ১৩৫৬ সাল মোতাবেক ১৯৭৭ খৃষ্টাব্দ, ইরানের বড় বড় শহরগুলোতে তখন রাজতন্ত্র বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। রেজা শাহ পাহলভী এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া ব্যক্তিদের কে ইরানের বিভিন্ন শহরে নির্বাসনে দিচ্ছিলো।
নির্বাসনের নিয়ম ছিলো, নির্বাসিত ব্যক্তি স্থানীয় থানায় প্রতিদিন এসে নির্দৃষ্ট সময়ে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করবেন। এছাড়া তিনি স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা করতে পারবেন এবং তার কাছ থেকে লিখিত নেয়া হতো যে, তিনি সেই শহর ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাবেন না।
সেসময় তরুণ আলেম সাইয়েদ আলী খামেনেয়ীকে গ্রেফতার করে ইরানের সিস্তান-বালুচিস্তান প্রদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ইরানশাহর শহরে নির্বাসন দেয়া হয়।
ইরানের শিয়া আলেমদেরকে সুন্নি প্রধান এলাকাগুলোতে নির্বাসনে দেয়া হত। যেন তাঁরা জনগণকে সংগঠিত করতে বা আমেরিকাপন্থি রেজা শাহ পাহলভীর বিরুদ্ধে কোন আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারেন।
সাইয়েদ আলী খামেনেয়ী ইরানশাহর শহরের একমাত্র শিয়াদের মসজিদ আলে রাসূল মসজিদে যাওয়া-আসা করতে লাগলেন। তিনি প্রতিদিন সেই মসজিদে নামাজের পরে সংক্ষিপ্ত বয়ানের মাধ্যমে মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরি করতে লাগলেন। মাইকের মাধ্যমে বয়ানের সেআওয়াজ পৌঁছে যেত মসজিদের আশেপাশের শিয়া-আহলে সুন্নতসহ সকলের কাছে। তিনি স্থানীয় আহলে সুন্নতের আলেমদের সাথে কথা বলে শিয়া-সুন্নি বিভেদ কমিয়ে সবাইকে এক করার চেষ্টা করলেন।
সাইয়েদ আলী খামেনেয়ী আহালে সুন্নতের মসজিদ মসজিদে নূরের ইমামকে সাথে নিয়ে ১২ থেকে ১৭ রবিউল আউয়াল পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সা. উপলক্ষে শিয়া-সুন্নি ঐক্যবদ্ধভাবে মাহফিলের আয়োজন করলেন। যা বিপ্লব পরবর্তী সময় থেকে এখনও ইরানে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামী ঐক্য সপ্তাহ হিসেবে পালন করা হচ্ছে।
ইরানশাহর শহর ও আশেপাশের এলাকাগুলোতে হঠাৎ বন্যা হলো। পুরো শহর পানিতে ডুবে গেল, ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ল, মানুষ হয়ে গেল অসহায়। তিনি বসে থাকলেন না; মানুষকে সংগঠিত করলেন, খাবারের ব্যবস্থা করলেন, অন্য শহরেও খাবার পাঠালেন। অল্প সময়ের মধ্যেই মসজিদকে ত্রাণকেন্দ্রে পরিণত করলেন। ক্ষুধার্ত মানুষের মাঝে খাবার বিলি হলো, আশ্রয়হীনদের পাশে দাঁড়ানো হলো। তিনি নিজে কাঁদলেন মানুষের কষ্ট দেখে, বিশেষ করে এক মৃত শিশুর লাশ দেখে তার হৃদয় ভেঙে যায়।
দিন যেতে লাগলো। মানুষের দুঃখে পাশে থাকতে থাকতে তিনি হয়ে উঠলেন সবার প্রিয় মানুষ। যে শহরে কেউ তাকে চিনত না, সেই শহরের মানুষই তাকে ভালোবাসতে শুরু করলো। এভাবে সাইয়েদ আলী খামেনেয়ী সিস্তান-বালুচিস্তান প্রদেশের শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে সকল জনগণের হৃদয়ে জায়গা করে নিলেন। অবশেষে যখন তাঁকে আবার পাহলভী সরকারের পক্ষ থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো, তখন পুলিশ ভয় পেল, তখন এই “নির্বাসিত মানুষ” মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।
বিপ্লব পরবর্তী সময়েও যখনই কোম শহরে আহলে সুন্নতের কোন মানুষ ইরানের সিস্তান-বালুচিস্তান প্রদেশের থেকে আগমন করতেন, তখন তারা সাইয়েদ আলী খামেনেয়ীর সাথে দেখা না করে যেতেন না। সিস্তান-বালুচিস্তানের মুরব্বিরা তাদের সন্তানদের বলে দিতেন, কোমে গেলে আমার সালাম সাইয়েদ আলী খামেনেয়ীকে পৌঁছে দিও।
আমেরিকা-ইসরাইলের অন্যায় আক্রমণে ৪০ দিন পূর্বে সাইয়েদ আলী খামেনেয়ী শহীদ হয়েছেন, আল্লাহ তাঁকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন…আমিন।
– আবু সালেহ
১০ এপ্রিল, ২০২৬
Leave a Reply