‘১০৫ বছরে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ: অর্জন ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান দূতাবাসের সম্মানিত রাষ্ট্রদূত মি. জালিল রাহিমি জাহানাবাদি । রাষ্ট্রদূত বলেন, ভাষা হল যোগাযোগের মাধ্যম। কোরীয়ান বা চাইনিজ ভাষার মাধ্যমে সে দেশের ইতিহাস -সংস্কৃতি জানতে পারি, এমনকি সে দেশের মানুষের চিন্তাভাবনা, অনুভূতি – আবেগও ভাষার মাধ্যমে উপলব্ধি করতে পারি। এখন প্রশ্ন হল, আপনি যখন ফারসি ভাষা শিখেন, আপনি শুধু ইরান, আফগানিস্তান ও তাজিকিস্তানের ২০০ মিলিয়ন মানুষের সাথে যোগাযোগ করতেই শিখছেন নাকি ফারসি ভাষা শেখার মূল্যায়নটা এর চেয়ে অনেক বেশি ও কার্যকর?

ফারসি ভাষার রয়েছে ৫০০০ বছরের সভ্যতার পথচলার পটভূমি। অর্থাৎ মানব সভ্যতার শাসনব্যবস্থার ৫ হাজার বছরের অভিজ্ঞতা, নীতিশাস্ত্রে মানুষের ৫,০০০ বছরের অভিজ্ঞতা,সভ্যতা – সংস্কৃতি, সাহিত্য, সুখ ও দুঃখের ৫০০০ বছরের অভিজ্ঞতা এভাষার রয়েছে৷ ফারসি ভাষা শেখার মাধ্যমে আপনারা এসব কিছুর সাথে শরীক হতে পারবেন। জাতিসংঘে মানবাধিকারের কথা বলা হয়েছে প্রায় ৬০/৭০ বছর আগে অথচ ইরানের সাইরাস দ্য গ্রেট মানবাধিকারের কথা বলেছেন প্রায় ৩০০০ বছর আগেই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা যেখানে কয় বছর আগে শ্রমিকের অধিকার সেখানে ইরানের পার্সেপোলিসে কয়েক শতক আগেই শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে৷ পাশ্চাত্যে কয়েক বছর আগেই নারীদের ভোটার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, আর ৫০০০ বছরের ইরানের ইতিহাসের সম্রাজ্ঞীদের শাসনের কথাও শুনবেন। ফারসি ভাষা শুধু ইরানিদের ভাষাই না, এটি মানবাধিকার, শ্রমিক অধিকার, নারী অধিকার, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং ৫০০০ বছর অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানবজাতির ভাষা। এমনকি বাংলাভাষা ভাষীদের পূর্বপুরুষের ভাষা ছিল ফারসি।

১৪৫০ বছর আগে ইসলাম পারস্যে প্রবেশ করে। মুসলমানদের অন্যতম বড় মাযহাব এটা হানাফী মাযহাব, যা ভারতবর্ষ, তুরস্ক, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও আরবি ভাষা ভাষী দেশগুলোতে বেশি বিস্তৃত। এই মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আবু হানিফা (র) ইরানে জন্মগ্রহণ করেন এবং তার পিতা ও ইরানে জীবনযাপন করেছিলেন ৷ ফারসি ভাষা শেখার প্রবেশপথ দিয়ে আপনি মানবজাতির ইতিহাস, অসীম এবং অন্তহীন মানব অভিজ্ঞতা,অন্তহীন নীতিশাস্ত্র, রহস্যবাদ এবং ধর্মতত্ত্বের দুনিয়ায় প্রবেশ করবেন। বাংলাদেশ এবং উপমহাদেশের জন্য ফারসি ভাষা শিক্ষাটা অনেক জরুরী। ভাষা শুধুই যোগাযোগের মাধ্যম নয় ভাষা জাতির পরিচয়, সংস্কৃতি, চিন্তা চেতনা ও ধ্যানের সমৃদ্ধির মাধ্যেম। শাহনামা রচনার মাধ্যমে কবি ফেরদৌসী ফারসি ভাষাকে সংরক্ষন করেছে। একই ভাবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে হলেও এর ভাষা, পরিচয়, স্বকীয়তা, সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে সংরক্ষণ করতে হবে। ফারসি ভাষা হল আপনাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং সভ্যতার অংশ। ফারসি ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে আপনাদের অতীতকে পুনর্জীবিত করে তুলুন, মানবসভ্যতা গড়ে তুলুন এবং এই ভাষার ধ্যান ধারণা নিজেদের মধ্যে গড়ে তুলুন ও ব্যবহার করুন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সাথে সম্মিলিত হয়ে ঢাকাস্থ ইসলামী প্রজাতন্ত্রী ইরান দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত জনাব জালিল রাহিমি জাহানাবাদি উল্লেখযোগ্য কিছু কাজ করার করা নিশ্চিত করেছেন৷ এগুলো হল:
★ ইসলামি প্রজাতন্ত্রী ইরান সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে অনলাইন প্লাটফর্ম এর মাধ্যমে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে উন্নত গবেষণা, সেমিনার, লাইব্রেরি গঠন বিষয়ক কাজ করা।
★এ বিভাগের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক ও গবেষকদের ইরানে সফরের ও শিক্ষাভ্রমণের ব্যবস্থা করা।
★ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষক শিক্ষিকাদের প্রশিক্ষণ প্রদান।
★ইরানি সিনেমা, সংস্কৃতি ও সাহিত্য নিয়ে সাপ্তাহিক প্রোগ্রামের আয়োজন।
(লেখাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মুমিত আল-রশীদের ফেসবুক টাইমলাইন থেকে সংগৃহীত)

Leave a Reply